সাহিত্য কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সাহিত্য কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

অমরত্ব | প্রবন্ধ

হুমায়ুন আহমেদ |

আমার বাবার ফুফুর নাম সাফিয়া বিবি। তিনি অমরত্বের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। তাঁর স্বামী, পুত্র-কন্যারা মরে গেল, নাতি মরে গেল, তিনি আর মরেন না। চোখে দেখেন না, নড়তে-চড়তে পারেন না। দিন-রাত বিছানায় শুয়ে থাকার কারণে পিঠে বেড সোর [শয্যাকণ্টক] হয়ে গেল। পচা মাংসের গন্ধে কাছে যাওয়া যায় না। রাতে তাঁর ঘরের চারপাশে শিয়াল ঘুরঘুর করে। পচা মাংসের গন্ধে একদিন তাঁর ঘরের টিনের চালে দুটি শকুন এসে বসল। টিন বাজিয়ে, ঢিল ছুড়ে শকুন তাড়ানো হলো। সেই তাড়ানোও সাময়িক, এরা প্রায়ই আসে। কখনো একা, কখনো দলেবলে।

কৃষ্ণকান্তের উইল | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | ১ম খন্ড

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় |

প্রথম পরিচ্ছেদ

হরিদ্রাগ্রামে এক ঘর বড় জমীদার ছিলেন। জমীদার বাবুর নাম কৃষ্ণকান্ত রায়। কৃষ্ণকান্ত রায় বড় ধনী; তাঁহার জমীদারীর মুনাফা প্রায় দুই লক্ষ টাকা। এই বিষয়টা তাঁহার ও তাঁহার ভ্রাতা রামকান্ত রায়ের উপার্জিত। উভয় ভ্রাতা একত্রিত হইয়া ধনোপার্জন করেন। উভয় ভ্রাতার পরম সম্প্রীতি ছিল, একের মনে এমত সন্দেহ কস্মিন্ কালে জন্মে নাই যে, তিনি অপর কর্তৃক প্রবঞ্চিত হইবেন। জমীদারী সকলই জ্যেষ্ঠ কৃষ্ণকান্তের নামে ক্রীত হইয়াছিল। উভয়ে একান্নভুক্ত ছিলেন। রামকান্ত রায়ের একটি পুত্র জন্মিয়াছিল— তাহার নাম গোবিন্দলাল। পুত্রটি জন্মাবধি, রামকান্ত রায়ের মনে মনে সংকল্প হইল যে, উভয়ের উপার্জিত বিষয় একের নামে আছে, অতএব পুত্রের মঙ্গলার্থ তাহার বিহিত লেখাপড়া করাইয়া লওয়া কর্তব্য। কেন না, যদিও তাঁহার মনে নিশ্চিত ছিল যে, কৃষ্ণকান্ত কখনও প্রবঞ্চনা অথবা তাঁহার প্রতি অন্যায় আচরণ করার সম্ভাবনা নাই, তথাপি কৃষ্ণকান্তের পরলোকের পর তাঁহার পুত্রেরা কি করে, তাহার নিশ্চয়তা কি?

ধূসর পান্ডুলিপি | কাব্যগ্রন্থ | জীবনানন্দ দাশ

জীবনানন্দ দাশ |


অনেক আকাশ

গানের সুরের মতো বিকালের দিকের বাতাসে
পৃথিবীর পথ ছেড়ে — সন্ধ্যার মেঘের রঙ খুঁজে
হৃদয় ভাসিয়া যায় — সেখানে সে কারে ভালোবাসে! —
পাখির মতন কেঁপে — ডানা মেলে — হিম চোখ বুজে
অধীর পাতার মতো পৃথিবীর মাঠের সবুজে
উড়ে উড়ে ঘর ছেড়ে কত দিকে গিয়েছে সে ভেসে —
নীড়ের মতন বুকে একবার তার মুখ গুঁজে

দৈব সংযোগ | ছোটগল্প

ইফতেখার আমিন |

অনেকক্ষণ ধরে কাশির মতো আওয়াজ করছিল ইঞ্জিন, হঠাৎ হঠাৎ থেমে পড়ার হুমকি দিচ্ছিল গাড়ি। কিন্তু এ রকম হওয়ার কথা ছিল না। লন্ডন ছাড়ার আগে পরিচিত মেকানিক দিয়ে ইঞ্জিন থরো চেক-আপ করিয়ে নিয়েছিলাম। তার পরও…শেষবারের মতো আরও দুটো ঝাঁকি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল গাড়ি। আমরা তখন একটা খাড়া পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছি।
ইয়া আল্লা! মনে মনে বললাম, এই বুনো কান্ট্রিসাইডে ফেঁসে না যাই! মানুষ বাস করে এমন কোথাও পৌঁছাতে সাহায্য করো।

বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ঝরাপালক | কাব্যগ্রন্থ | জীবনানন্দ দাশ

অস্তচাঁদে

ভালোবাসিয়াছি আমি অস্তচাঁদ, -ক্লান্ত শেষপ্রহরের শশী!
-অঘোর ঘুমের ঘোরে ঢলে যবে কালো নদী-ঢেউয়ের কলসী,
নিঝ্ঝুম বিছানার পরে
মেঘবৌ’র খোঁপাখসা জোছনাফুল চুপে চুপে ঝরে,-
চেয়ে থাকি চোখ তুলে’-যেন মোর পলাতকা প্রিয়া
মেঘের ঘোমটা তুলে’ প্রেত-চাঁদে সচকিতে ওঠে শিহরিয়া!

সাক্ষাৎকার | তাহমিমা আনাম

tahmin anam
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: মশিউল আলম
তাহমিমা আনাম প্রশ্ন: ২০০৭ সালে আপনার প্রথম উপন্যাস দ্য গোল্ডেন এজ প্রকাশের তিন বছর পর এ বছরের মে মাসে ইংল্যান্ড, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে আপনার দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য গুড মুসলিম। ঢাকার প্রথমা প্রকাশনও গত ২১ নভেম্বর উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে এবং এখন তা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। উপন্যাসটি সম্পর্কে কিছু বলুন।
তাহমিমা আনাম: আমার প্রথম উপন্যাস দ্য গোল্ডেন এজ তিন খণ্ডে পরিকল্পিত এক উপন্যাসলহরীর প্রথম খণ্ড। দ্বিতীয় খণ্ড হিসেবে বেরোল দ্য গুড মুসলিম।

লৌহকার | ছোটগল্প

সুদিপ্ত শাহীন |

— লালু ছোট ভাই হয়ে এত কিছু পারে! আর তোমার নুন আনতে পান্তা ফুরায়! আহা রে মরদ আমার?
—চুপ কর। মুখে খালি আজেবাজে কথা।
—আজেবাজে কথা হবে না তো কী রসগোল্লার রস চুয়ে চুয়ে পড়ব?
—পড়লে তো ভালোই হতো!
—উঁহু, পড়লে তো ভালোই হতো। মরদ ব্যাটা, মরদের মতো কথা কবা। তেল ছাড়া বাত্তি জ্বলে, যে পাত্তি ছাড়া মিষ্টি কথা শুনবা? কী দিছো আমারে মিষ্টি কথা শুনবার চাও?
রাগে গরগর করতে করতে রান্নাঘরে চলে যায় কালু কামারের বউ। সন্ধ্যা থেকেই তিরিক্ষি মেজাজ। জোরদার কারণও আছে। কালু, লালু দুই ভাই। দুজনই কামার।

বাংলা সাহিত্যের নায়িকারা

মর্তজা বশির |

                               kapila
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি কালজয়ী উপন্যাস। এর পটভূমি বাংলাদেশের বিক্রমপুর-ফরিদপুর অঞ্চল। এই উপন্যাসের দেবীগঞ্জ ও আমিনবাড়ি পদ্মার তীরবর্তী গ্রাম। উপন্যাসটি কলকাতা থেকে সঞ্জয় ভট্টাচার্য সম্পাদিত পূর্বাশা মাসিক পত্রিকায় জ্যৈষ্ঠ ১৩৪১ থেকে শ্রাবণ ১৩৪২ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে নয় কিস্তি ছাপার পর প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। এক বছর পর ১৯৩৬-এর মে মাসে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। পূর্বাশা পত্রিকায় ছাপার সময় দেবীগঞ্জ ও আমিনবাড়ির এই দুটি স্থানের নাম ছিল যথাক্রমে গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ী।

বুধবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৬

তাসের ঘর | ছোটগল্প

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় |

অমর শখ করিয়া চায়ের বাসনের সেট কিনিয়াছিল। ছয়টা পিরিচ, পেয়ালা, চাদানি ইত্যাদি রঙ-চঙ করা সুদৃশ্য জিনিস, দামও নিতান্ত অল্প নয়- চার টাকা। চার টাকা মধ্যবিত্ত গৃহস্থের পক্ষে অনেক।
অমরের মায়ের হুকুম ছিল,সেটটি যত্ন করে তুলে রেখো বউমা, কুটুম্বসজ্জন এলে, ভদ্রলোকজন এলে বের করো।
কলিকাতা-প্রবাসী, হলেন্দ্রবাবুরা দেশে আসিয়াছেন, আজ তাঁহাদের বড়ির মেয়েরা অমরদের বাড়িতে বেড়াইতে আসিবেন; তাহারই উদ্যোগ-আয়োজনে বাড়িতে বেশ সমারোহ পড়িয়া গিয়াছে।
মা বলিলেন, চায়ের সেটটা আজ বের কর তো গৌরী।

বেদেনী | ছোটগল্প

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় |

শম্ভু বাজিকর এ মেলায় প্রতি বৎসর আসে। তাহার বসিবার স্থানটা মা কঙ্কালীর এস্টেটের খাতায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো কায়েমি হইয়া গিয়াছে। লোকে বলে, বাজি; কিন্তু শম্ভু বলে ‘ভোজবাজি-ছারকাছ’।

ছোট তাঁবুটার প্রবেশপথের মাথার উপরেই কাপড়ে আঁকা একটা সাইনবোর্ডেও লেখা আছে ‘ভোজবাজি-সার্কাস’। লেখাটার একপাশে একটা বাঘের ছবি, অপরদিকে একটা মানুষ, তাহার এক হাতে রক্তাক্ত তরবারি, অপর হাতে একটি ছিন্নমুণ্ডু। প্রবেশমূল্য মাত্র দুইটি পয়সা। ভিতরে আছে কিন্তু ‘গোলকধামে’র খেলা। ভিতরে পট টাঙাইয়া কাপড়ের পর্দায় শম্ভু মোটা লেন্স লাগাইয়া দেয়, পল্লীবাসীরা বিমুগ্ধ বিস্ময়ে সেই লেন্সের মধ্যে দিয়া দেখে ‘আংরেজ লোকের যুদ্ধ,’ ‘দিল্লীকা বাদশা’, ‘কাবুলকে পাহাড়’, ‘তাজ-বিবিকা কবর’। তারপর শম্ভু লোহার রিং লইয়া খেলা দেখায়, সর্বশেষে একটা পর্দা ঠেলিয়া দিয়া দেখায় খাঁচায় বন্দি একটা চিতাবাঘ।

উকিলের চিঠি | ছোটগল্প

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় |

ও মিছরি, তোর নামে একটা চিঠি এসেছে দেখগে যা। এই বলে মিছরির দাদা ঋতিশ টিয়ার ঝাঁক তাড়াতে খেতের মধ্যে নেমে গেল।

গোসাবা থেকে দুই নৌকা বোঝাই লোক এসেছে অসময়ে। লাট এলাকার ভিতর বাগে কোনও বিষয়কর্মে যাবে সব। এই অবেলায় তাদের জন্য খিচুড়ি চাপাতে বড় কাঠের উনুনটা ধরাতে বসেছিল মিছরি। কেঁপে উঠল। তার ভরন্ত যৌবন বয়স। মনটা সময়ে অন্যধারে থাকে, শরীরটা এই এখানে। আজকালটা ভার লাগে তার। মনে হয়, ডানা নেই মানুষের।

উকিলের চিঠি শুনে যে উনুন ফেলে দৌঁড়াবে তার জো নেই। বাবা গুলিপাকানো চোখে দেখছে উঠোনের মাঝখানে চাটাইতে বসে। বড় অতিথিপরায়ণ লোক। মানুষজন এলে তার হাঁকডাকের সীমা থাকে না। তা ছাড়া দাদু, ঠাকুমা, জ্যাঠা-কাকারা সব রয়েছে চারধারে। তাদের চোখ ভিতর বার সব দেখতে পায়। উটকো লোকদের মধ্যে কিছু বিপ্রবর্ণের লোক রয়েছে, তারা অন্যদের হাতে খাবে না। সে একটা বাঁচোয়া, রান্নাটা করতে হবে না তাদের। চাল-ডাল ওরাই ধুয়ে নিচ্ছে পুকুরে। বাঁকে করে দু-বালতি জল নিয়ে গেছে কামলারা। উনুনটা ধাঁধিয়ে উঠতেই মিছরি সরে গিয়ে আমগাছতলায় দাঁড়াল।

দেখা হবে | ছোটগল্প

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় |

নকশি কাঁথার মতো বিচিত্র এক পৃথিবী ছিল আমাদের শৈশবে। এখনও পায়ের তলায় পৃথিবীর মাটি, চারিদিকে গাছপালা, মাথার ওপর আকাশ। বুক ভরে শ্বাস টেনে দেখি। না, শীতের সকালে কুয়াশায় ভেজা বাগান থেকে যে রহস্যময় বন্য গন্ধটি পাওয়া যেত তা আর পাওয়া যায় না। আমাদের সাঁওতাল মালি বিকেলের দিকে পাতা পুড়িয়ে আগুন জ্বালত। সেই গন্ধ কতবার আমাকে ভিন্ন এক জন্মের স্মৃতির দিকে টেনে নিয়ে গেছে। আর মনে আছে মায়ের গায়ের ঘ্রাণ। সে গন্ধে ঘুমের ভেতরেও টের পেতাম, মা অনেক রাতে বিছানায় এল। মা’র দিকে পাশ ফিরে শুতাম ঠিক। তখন নতুন ক্লাশে উঠে নতুন বই পেতাম ফি বছর। হাতে পায়ে কদমের রেণু লেগে থাকত বুঝি। কী ছিল! কী থাকে মানুষের শৈশবে! বিকেলের আলো মরে এল যেই অমনি পৃথিবীটা চলে যেত ভুতেদের হাতে।

অজান্তে | ছোটগল্প

বনফুল |

সেদিন আপিসে মাইনে পেয়েছি।
বাড়ী ফেরবার পথে ভাবলাম ‘ওর’ জন্যে একটা ‘বডিস্‌’ কিনে নিয়ে যাই। বেচারী অনেক দিন থেকেই বলছে।
এ-দোকান সে-দোকান খুঁ’জে জামা কিনতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। জামাটি কিনে বেরিয়েছি–বৃষ্টিও আরম্ভ হল। কি করি–দাঁড়াতে হল। বৃষ্টিটা একটু ধরতে–জামাটি বগলে ক’রে–ছাতাটি মাথায় দিয়ে যাচ্ছি। বড় রাস্তাটুকু বেশ এলাম–তার পরই গলি, তা-ও অন্ধকার।
গলিতে ঢুকে অন্যমনস্ক হয়ে ভাবতে ভাবতে যাচ্ছি–অনেকদিন পরে জা নতুন জামা পেয়ে তার মনে কি আনন্দই না হবে! আজ আমি–
এমন সময় হঠাৎ একটা লোক ঘাড়ে এসে পড়ল। সেও পড়ে গেল, আমিও পড়ে গেলাম–জামাটি কাদায় মাখামাখি হয়ে গেল।

অমলা | ছোটগল্প

বনফুল |

অমলাকে আজ দেখতে আসবে। পাত্রের নাম অরুণ। নাম শুনেই অমলার বুকটিতে যেন অরুণ আভা ছড়িয়ে গেল। কল্পনায় সে কত ছবিই না আঁকলে। সুন্দর, সুশ্রী, যুবা–বলিষ্ঠা, মাথায় টেরি, গায়ে পাঞ্জাবি–সুন্দর সুপুরুষ।

অরুণের ভাই বরুণ তাকে দেখতে এল। সে তাকে আড়াল থেকে দেখে ভাব্‌লে–‘আমার ঠাকুরপো!’
মেয়ে দেখা হয়ে গেল। মেয়ে পছন্দ হয়েছে। একথা শুনে অমলার আর আনন্দের সীমা নেই। সে রাত্রে স্বপ্নই দেখলে!
বিয়ে কিন্তু হল না–দরে বন্‌ল না।

আত্ন-পর | ছোটগল্প

বনফুল |

সারা সকালটা খেটেখুটে দুপুর বেলায় দক্ষিণ দিকের বারাণ্ডায় একটা বিছানা পেতে একটু শুয়েছি। তন্দ্রাটি যেই এসেছে–অমনি মুখের উপর খপ্‌ ক’রে কি একটা পড়ল। তাড়াতাড়ি উঠে দেখি একটা কদাকার কুৎসিত পাখীর ছানা। লোম নেই–ডানা নেই–কিম্ভূতকিমাকার! বাগে ও ঘৃণায় সেটাকে উঠোনে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম।

কাছেই একটা বেড়াল যেন অপেক্ষা করছিল–টপ।। করে মুখে করে নিয়ে গেল। শালিক পাখীদের আর্তরব শোনা যেতে লাগল।
আমি এপাশ ওপাশ করে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।
তারপর চার পাঁচ বছর কেটে গেছে!

একফোঁটা জল | ছোটগল্প

বনফুল |

রামগঞ্জের জমিদার শ্যামবাবু যে খেয়ালী লোক তা জানতাম। কিন্তু তাঁর খেয়াল যে এতদূর খাপছাড়া হতে পারে তা ভাবিনি। সেদিন সকালে উঠেই এক নিমন্ত্রণ পত্র পেলাম। শ্যামবাবু তাঁর মাতৃশ্রাদ্ধে সবান্ধবে নিমন্ত্রণ করেছেন। চিঠি পেয়ে আমার মনে কেমন যেন একটু খটকা লাগল। ভাবলাম–শ্যামবাবুর মায়ের অসুখ হল অথচ আমি একটা খবর পেলাম না! আমি হলাম এদিককার ডাক্তার।
যাই হোক নেমন্ত্রন্ন যখন করেছেন তখন যেতেই হবে। গেলাম। গিয়ে দেখি শ্যামবাবু গলায় কাচা নিয়ে সবাইকে অভ্যর্থনা করছেন। তাঁর মুখে একটা গভীর শোকের ছায়া। আমাকে দেখেই বল্লেন, “আসুন ডাক্তারবাবু–আসতে আজ্ঞা হোক্‌!”

খেঁদি | ছোটগল্প

বনফুল |

তখন সবে সন্ধ্যা।–মালতী ঘরে এসে প্রদীপটা জ্বালতেই তার স্বামী বলে উঠল–“লতি…আমি একটা নাম ঠিক করেছি।”
“কি?”
“ওই যে তুমি বল্লে–‘কি’।”
“তার মানে?”
“ইংরিজি key মানে চাবি আর বাঙলা ‘কি’–একটা প্রশ্ন। মেয়ে মানুষের পক্ষে বেশ মানানসই নাম হবে।”
“এখন কোথায় কি তার ঠিক নেই–এখন থেকেই নামকরণ! আর আমার মেয়েই হবে তুমি জান্‌লে কি করে? ও জ্যোতিষীর কথায় আমার একটুও বিশ্বাস নেই।”

চোখ গেল | ছোটগল্প

বনফুল |

সাধারণের চোখে হয়ত সে সুশ্রী ছিল না।
আমিও তাহাকে যে খুব সুন্দরী মনে করিতাম তাহা নহে–কিন্তু তাহাকে ভালবাসিতাম। তাহার চোখ দুটিতে যে কি ছিল তাহা জানি না। তেমন স্বপ্নময় সুন্দর চোখ জীবনে কখনও দেখি নাই। দুষ্টু বলিয়াও তাহার অখ্যাতি ছিল।
সেই কুরূপা এবং চঞ্চলা মিনি আমার চিত্ত-হরণ করিয়াছিল! তাহার চোখ দেখিয়া আমি মুগ্ধ হইয়াছিলাম।
মনে আছে তাহাকে একদিন নিভৃতে আদর কইয়া বলিয়াছিলাম–“ইচ্ছে করে তোমার চোখ দুটো কেডে রাখি।”
“কেন?”
“ওই দুটোই ত আমাকে পাগল করেছে। আমি সব চেয়ে ওই দুটোকেই ভালবাসি।”
এত ভালবাসিতাম–কিন্তু তবু তাহাক পাই নাই।

পারুল প্রসঙ্গ | ছোটগল্প

বনফুল |

“ও কি তোমাদের মত উপায় ক’রে খাবে নাকি?”
“উপায় ক’রে না খাক–তা ব’লে মাছ দুধ চুরি ক’রে খাওয়াটা–”
“আমার ভাগের মাছ দুধ আমি ওকে খাওয়াব!”
“সে তো খাওয়াচ্ছই–তাছাড়াও যে চুরি করে। এরকম রোজ রোজ–”
“বাড়িয়ে বলা কেমন তোমার স্বভাব। রোজ রোজ খায়?”
“যাই হোক–আমি বেড়ালকে মাছ দুধ গেলাতে পারব না। পয়সা আমার এত সস্তা নয়।”
এই বলিয়া ক্রুদ্ধ বিনোদ সমীপবর্তিনী মেনি মার্জারীকে লক্ষ্য করিয়া চাটজুতা ছুঁড়িল। মেনি একটি ক্ষুদ্র লম্ফ দিয়া মারটা এড়াইয়া বাহিরে চলিয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রী পারুলবালাও চক্ষে আঁচল দিয়া উঠিয়া গেলেন। বিনোদ খানিকক্ষণ গুম্‌ হইয়া রহিল। কতক্ষণ আর এ-ভাবে থাকিবে? অবশেষে তাহাকেও উঠিতে হইল। সে আসিয়া দেখে পশ্চিম বারান্দায় মাদুর পাতিয়া অভিমানে পারুলবালা ভূমি-শয্যা লইয়াছেন।
বিনোদ জিনিসটা লঘু করিয়া দিবার প্রয়াসে একটু হাসিয়া বলিল–“কি করছ ছেলেমানুষী! আমি কি সত্যি সত্যি তোমার বেড়াল তাড়িয়ে দিচ্ছি!”

বাড়তি মাশুল | ছোটগল্প

বনফুল |

একেই বলে বিড়ম্বনা।
আমি একজন ডেলি প্যাসেঞ্জার। সেদিন সমস্ত দিন আপিসে কলম পিষে উর্ধ্বশ্বাসে হাওড়ায় এসে লোকাল ট্রেণের একখানি থার্ড ক্লাসে বসে হাঁপাচ্ছি–এমন সময় দেখি সামনের প্লাটফর্ম থেকে বোম্বে মেল ছাড়ছে আর তারই একটি কামরায় এমন একখানি মুখ আমার চোখে পড়ে গেল যাতে আমার সমস্ত বুক আশা আনন্দে দুলে উঠল।
বহুদিন আগে এমার এক ছেলে তারকেশ্বরে মেলা দেখতে গিয়ে ভীড়ে কোথায় হারিয়ে যায়–আর ফেরেনি। অনেক খোঁজ-খবর করেছিলাম, কিছুতেই কিছু হয়নি। ভগবানের ইচ্ছা বলে মনকে প্রবোধ দিয়েছিলাম। আজ হঠাৎ তারই মুখখানি–হ্যাঁ ঠিক সেই মুখটিই বম্বে মেলের একটা কামরায় দেখতে পেলাম।
আর কি থাকতে পারি?